যুক্তরাষ্ট্র

ট্রাম্পবাদ থেকে সরে আসছে কি আমেরিকানরা?

ডিসেম্বর ১০, ২০২২ ৪:১২ দুপুর
ট্রাম্পবাদ থেকে সরে আসছে কি আমেরিকানরা?

জোসেফ ই স্টিগলিৎজ : গত মাসে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয়ী হয়ে ভীতিকর ‘লাল তরঙ্গ’ বইয়ে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্ব স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে। রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে সামান্য ব্যবধানে জিতলেও ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে মনে হচ্ছে আমেরিকান ভোটাররা রিপাবলিকানদের চরমপন্থা এবং ভণ্ডামি প্রত্যাখ্যান করেছেন। মনে হচ্ছে তাঁরা ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল নিয়ে মিথ্যা বলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক গণতান্ত্রিক নীতিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ডোনাল্ড ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীদের জয়কে অস্বীকার করেছেন। 

নির্বাচনের ফলাফলকে ভুলভাবে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে নিশ্চিতভাবেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু আমার মনে হয়, গড় যুক্তিনিষ্ঠ ভোটাররা দুই বছর ধরে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক সাফল্যকে স্বীকৃতি দেবে। তারা বাইডেনের কাজের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানাবেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পুনরুদ্ধার বিলের (আমেরিকান রেসকিউ প্ল্যান) বদৌলতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির দেশের সম্মান দ্রুততম সময়ে পুনরুদ্ধার করেছে। তারা এক বছরের ব্যবধানে শিশু দারিদ্র্য প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। 

এ ছাড়া কয়েক দশকের মধ্যে বাইডেনই প্রথমবারের মতো বড় অবকাঠামো বিল পাসের উদ্যোগ নিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য আমেরিকার প্রথম প্রধান আইনি প্রতিক্রিয়া সামনে এনেছেন; মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস আইন পাস করেছেন এবং ‘চিপস এবং সায়েন্স অ্যাক্ট’ নামের একটি প্রধান শিল্প-নীতি বিল পাস করেছেন, যা অর্থনীতিকে দৃঢ় করতে সরকারকে সহায়তা করছে। 

বাইডেনের এ উদ্যোগগুলো শুধু আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনিই প্রথম কোনো কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ দিয়েছেন; তিনি ছাত্র-ঋণে ছাড় দেওয়ার জন্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের যুগের জন্য আর্থিক বিধিমালা হালনাগাদ করতে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। তিনি আমেরিকাকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরিয়ে এনেছেন এবং বিশ্বমঞ্চে আমেরিকান নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারে উল্লেখযোগ্যভাবে সফল হয়েছেন। যদিও এর জন্য তিনি খুব কমই কৃতিত্ব পেয়েছেন। তবে ইতিহাস সম্ভবত রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে তাঁর নেতৃত্বের নিপুণতাকে মনে রাখবে। 

যেহেতু আমেরিকান নির্বাচকমণ্ডলী এখন রিপাবলিকান চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে মনে হচ্ছে, সেহেতু কেউ কেউ যুক্তি দেবেন, বাইডেনকে মধ্যপন্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে এগোতে হবে। কেন্দ্রবাদ হলো সরকারের বড় সমস্যাগুলোর একটি। এটি বামপন্থী চরমপন্থার ভাষ্যের মতো নয় যারা সব সময়ই বলে থাকে, আমেরিকান অর্থনীতি বেশির ভাগ আমেরিকানদের সেবা দিচ্ছে না। বাইডেনের সরকারের কাছে আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার এখন যতটা করছে, তার চেয়ে অনেক ভালো কাজ করা উচিত। 

আমেরিকার মানুষ জানে যুক্তরাষ্ট্র একটি অসাধারণ ধনী দেশ। তারা জানে, আমেরিকা অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি ধনী। কিন্তু আমেরিকার চেয়ে কম ধনী অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে উন্নত জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করছে। আমেরিকার নাগরিকেরা কতটা সুযোগ-সুবিধা ও পরিষেবা পাবেন, তা আসলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পছন্দের বিষয়। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে বলা যায়, বিষয়টি একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারা গৃহীত সিদ্ধান্তের ফলাফল, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের স্বার্থকে প্রতিফলিত করে না; কারণ এটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করে। 

বেশির ভাগ আমেরিকান মনে করেন, ফেডারেল ন্যূনতম মজুরি দ্রুত বৃদ্ধি করা উচিত; অন্তত দ্বিগুণ করা উচিত, কারণ ২০০৯ সাল থেকে মজুরি বাড়ানো হয়নি। একইভাবে বেশির ভাগ আমেরিকান বিশ্বাস করেন, মৌলিক মানবাধিকার হিসাবে প্রত্যেককেই স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা উচিত। এ বিষয়েও সাধারণভাবে সবাই একমত যে যারা কলেজ শিক্ষা থেকে উপকৃত হতে পারে, তাদের প্রত্যেককেই কম খরচে পড়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। অর্থাৎ পিতা–মাতার আয় যা-ই হোক না কেন, তাদের ওপর ঋণের বোঝা না চাপিয়েও যাতে ছেলেমেয়েরা কলেজের শিক্ষা নিতে পারে, সে ব্যবস্থা রাখা উচিত। এবং সব আমেরিকান একটি নিরাপদ অবসরকালীন জীবন এবং শোভন সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন সুবিধা চায়।

এ সমস্যাগুলোর নীতিগত সমাধানের দাবি করা বামপন্থা বা চরমপন্থা নয়। আমাদের পরিবেশ রক্ষা করা, আমাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা, আর্থিক প্রতিযোগিতা জোরদার করা এবং আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রত্যেককে বলতে দেওয়া সাধারণ সব মানুষের দাবি। প্রাচীনকালে বিচ্ছিন্ন কৃষকেরা হয়তো চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু চুরি ও সহিংসতা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য তাদেরও সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজন হতো। এবং তারা যে বাজারে ব্যবসা করত, সে বাজারকে যথাযথ কার্যকর করতে সরকারি বিধিবিধানের প্রয়োজনও ছিল। আজ আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছি। এগুলো আমাদের সামনে হুমকি। এগুলো মোকাবিলা করতে আমাদের একীভূত হওয়া দরকার। বাইডেনের কাছে আমেরিকার যুক্তিনিষ্ঠ মানুষ সেই বার্তা আশা করে। 

আজকের প্রযুক্তি-স্বাধীনতাবাদীরা এই সব উপেক্ষা করে, কারণ তারা এটি বুঝতে ব্যর্থ হয় বা তারা মেনে নিতে অস্বীকার করে যে একজন ব্যক্তির কাছে যা স্বাধীনতা, অন্য ব্যক্তির কাছে তা স্বাধীনতা না–ও হতে পারে। একজন ব্যক্তির মুখোশ না পরার বা ভ্যাকসিন না নেওয়ার অধিকার অন্যের সংক্রামক ভাইরাস থেকে সুরক্ষার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করে। একজন ব্যক্তির একটি অটোমেটিক রাইফেল বহন করার অধিকার প্রায়ই অন্য অনেক ব্যক্তির বেঁচে থাকার অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলে। এ অধিকারগুলোকে ওজন করতে বলা হলে বেশির ভাগ যুক্তিবাদী লোক যেকোনো এক পক্ষের দিকে যাবে। তারপরও দুই পক্ষের মধ্যে একটি সাধারণ ঐকমত্য থাকতে হবে। 

২০২২ সালের নির্বাচন থেকে বোঝা যায়, ভোটারদের একটি বড় অংশ নিদেনপক্ষে ট্রাম্পের রাজনীতি এড়িয়ে চলতে চায়। তঁারা সামনের চ্যালেঞ্জগুলো উপলব্ধি করেন। এ কারণে তাঁদের মধ্যে একধরনের ঐক্যের আভাস মিলছে। জোসেফ ই স্টিগলিৎজ নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ । ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট