কোনো দেশে বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাই যদি প্রধান থাকে, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষও শ্রেণিগত লিঙ্গীয় বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হন। যারা সংখ্যালঘু জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষ, তারা এসব সমস্যার মধ্যে তো থাকেনই, নিজেদের জাতিগত, বর্ণগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তারা আরও বাড়তি চাপের শিকার হন। আবার একই ধর্মের মধ্যেও নানা ভাগ থাকে, সংখ্যায় গরিষ্ঠতা না থাকলেও ক্ষমতার জোরে ক্ষুদ্রগোষ্ঠী বৃহৎ জনসংখ্যার ওপর চড়াও হতে পারে। এর বড় দৃষ্টান্ত ভারত। যেখানে উচ্চবর্ণ সংখ্যায় কম হলেও তারাই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকায় বাকিদের বহুরকম সামাজিক সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক পীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। বিশেষত নিম্নবর্ণ ও দলিত সমাজের মানুষের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা আছে। ভারতের গুজরাটে নৃশংস হত্যা ও নির্যাতন হয়েছিল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে, নানা অজুহাতে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দু ও বৌদ্ধদের মন্দির, প্রতিমা ও ঘরবাড়িতে হামলা হয়েছে। সেগুলোতে এই ধর্মীয় পরিচয়কেই প্রধান করে হিংস্র উন্মাদনা তৈরি করেছে অপরবিদ্বেষী এবং দখল-লুণ্ঠনকারীরা। রামু থেকে শুরু করে গত কয়েক বছরের সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো নিয়ে সরকারি প্রশাসনের নির্লিপ্ততা, অপরাধীদের শনাক্ত করবার ব্যাপারে দীর্ঘসূত্রিতা প্রায় একইরকম। বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি ভারতের বর্তমান সরকারের ভূমিকাও বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। মোদী সরকার ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে কোনো হিন্দু যদি ভারতে আশ্রয় চান, সঙ্গে সঙ্গে তাকে নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়া হবে।’ বাংলাদেশে কোথাও সাম্প্রদায়িক হামলা হলে যেভাবে ভারতীয় প্রশাসন ও এদেশে তাদের দূতাবাস প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, তাতে কারও কাছে মনে হতে পারে যে, বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দুদের পাশে দাঁড়াচ্ছে তারা। কিন্তু তাদের ভূমিকায় এদেশের হিন্দু পরিচয়ের মানুষদের নিরাপত্তাহীনতা কমে না, বরং পরিস্থিতি আরও অপমানজনক হয়। এদেশে যারা সারাক্ষণ দাবি করে ‘হিন্দুরা ভারতের লোক’, তাদের গলার জোর বাড়ায়। ভারতের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরাই বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক ফায়দা ওঠাতে সাহায্য করে বলেই এ নিয়ে তাদের এত উৎসাহ। তার মানে বাংলাদেশে যারা বিভিন্ন অজুহাতে ইসলামের নামে মন্দির বা হিন্দুবাড়িতে হামলা করছে, তারা প্রকারান্তরে একদিকে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে সহায়তা করছে, অন্যদিকে ভারতের মুসলমানদের অবস্থাও নাজুক করছে।
শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয়, বহু দেশেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটা রেওয়াজ। বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগমূলক যেসব বক্তব্য আছে সেগুলোর মধ্যে আছে—‘হিন্দুরা ভারতকে নিজেদের দেশ মনে করে, বাংলাদেশকে নয়’, ‘হিন্দুরা ভারতে সম্পদ পাচার করে।’ প্রশ্ন হলো, এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মধ্যে যারা ক্ষমতাবান, তারা কি বাংলাদেশকে নিজের দেশ মনে করে? তাদের লুট করা সম্পদ কোথায় থাকে, এই দেশে না ভিনদেশে? একইরকম কথা ভারতের মুসলমানরাও শোনে। তাদেরও বলা হয় তারা পাকিস্তানকে নিজের দেশ মনে করে। কাশ্মীরে দশকের পর দশক ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে গ্রহণযোগ্যতা দিতে মুসলিমবিদ্বেষী এসব অপপ্রচার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এই আগ্রাসন আরও বাড়াতে মরিয়া। আসামে মুসলমানরা এখন রাষ্ট্রহীন হবার পথে। কলকাতার টিভিতে একবার ভারতে মুসলিম নির্যাতন নিয়ে বিজেপি ও বামপন্থী দুই নেতার বিতর্ক দেখেছিলাম। বিজেপি নেতা বাম নেতার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনারা শুধু ভারতে মুসলমান নির্যাতন দেখেন, বাংলাদেশে যে হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে সেটা দেখেন না কেন?’ ভারতের বামপন্থী ও সেকুলারদের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী বা বিজেপিপন্থীদের এটা একটা প্রবলভাবে প্রচারিত অভিযোগ যে, তারা ভারতের মুসলমানদের নিয়েই বেশি চিৎকার করেন, ব্যস্ত থাকেন, হিন্দুদের স্বার্থ তারা দেখেন না। হিন্দুদের স্বার্থের কথা বলে, হিন্দু গৌরব ফিরিয়ে আনার কথা বলেই বিজেপির হিন্দুত্ববাদী কট্টর রাজনীতি দাঁড়িয়েছে। কর্পোরেট স্বার্থকে ধর্মীয় উন্মাদনার মোড়কে ঢেকে বিজয়যাত্রার কূটকৌশল যে খুবই কার্যকর, তার প্রমাণ সর্বশেষ নির্বাচনে তাদের বিপুল বিজয়।
একই ঘটনা বাংলাদেশেও। এখানে যারা হিন্দুসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বা বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের উদ্দেশে ঠিক একইরকম অভিযোগ শোনা যায়। তখন বলা হয়, এরা সেকুলার বামপন্থী, এরা এদেশে শুধু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন দেখে। ভারতে যে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে তা তাদের চোখে পড়ে না। জাতিগত সংখ্যালঘু নিয়েও একই ধরনের প্রচার। পার্বত্য চট্টগ্রামে কিংবা সমতলের অ-বাঙালি বিভিন্ন জাতির মানুষদের ওপর নির্যাতন নিয়ে কথা বললেও এই অভিযোগ ওঠে, ‘এরা বাঙালিদের স্বার্থ দেখছে না।’ অথচ দু’দেশেই সাম্প্রদায়িকতা-জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে তারাই যথাযথভাবে সোচ্চার হন, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অন্যান্য শ্রেণিগত-লিঙ্গীয়-আঞ্চলিক নিপীড়ন বৈষম্য নিয়েও সাধ্যমতো সোচ্চার থাকেন। উত্তর ভারতের হিন্দু গুরু ও মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ বলেছেন, ‘সেকুলারিজম বলে কিছু হতে পারে না।’ একইরকম কথা বাংলাদেশেও অনেক ধর্মীয় নেতা বা সাম্প্রদায়িক লোকজনের মুখে শোনা যায়। কিন্তু দিল্লীর শাহী মসজিদের ইমাম বলেন, ‘আমরা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখার দাবি জানাই।’ ইউরোপ-আমেরিকার কট্টর শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানদের বিভিন্ন গোষ্ঠী মুসলমান আর অশ্বেতাঙ্গদের তাড়িয়ে খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ শাসন প্রতিষ্ঠায় বিষের রাজনীতি ছড়াচ্ছে। ট্রাম্প এখন এদেরই মুখ। অন্যদিকে ইউরোপ-আমেরিকার মুসলিম বা অন্যান্য জাতিধর্মের মানুষেরা রাষ্ট্রের ধর্ম ও বর্ণনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে দাঁড়াচ্ছেন, এ ছাড়া তাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়। ঐসব দেশের বামপন্থীরাই তাদের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ান। তাদেরও ‘সেকুলার বামপন্থী’ বলে তিরষ্কার করে বিদ্বেষীরা।
বাংলাদেশে যারা মনে করেন, যেহেতু এই দেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সুতরাং এই দেশ ইসলামপন্থী রাজনীতি দ্বারাই পরিচালিত হওয়া উচিত, তাদেরই হিন্দু সহচিন্তকরা মনে করেন ভারতকে অবশ্যই হিন্দুরাষ্ট্র হতে হবে, যেহেতু সেখানে হিন্দুরা প্রধান জনগোষ্ঠী। ‘যে ধর্মের মানুষ কোনো দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই দেশ তাদের ধর্মীয় আইন/নীতি/মতাদর্শ দ্বারাই পরিচালিত হবে’—এই অবস্থান গ্রহণ করলে বাংলাদেশ হবে ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে অনুযায়ী ভারত হবে হিন্দুরাষ্ট্র, ইউরোপ-আমেরিকা হয়ে হবে খ্রিস্টান রাষ্ট্র। তাহলে বলতে হবে, হিন্দুত্ববাদী শাসনের দাবি যুক্তিযুক্ত, ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে খ্রিস্টান কট্টরপন্থীদের মুসলিম অভিবাসী নিধন বা বিতাড়ন কর্মসূচিও তাহলে সমর্থন করতে হবে! এসব কুযুক্তির গভীরে গেলে দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের কট্টরপন্থীদের আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের মহাশত্রু মনে হলেও এদের সারবস্তু অভিন্ন, এরা আসলে পরস্পরের সহযোগী, শক্তিদাতা। আনুষ্ঠানিক হামলা কম বা বেশি হলেও দু’দেশেই প্রতিনিয়ত বিদ্বেষী সংস্কৃতির চাষ হয়। কিছুদিন আগে ঢাকায় একজন শিক্ষক ও শিল্পী তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। রাস্তায় তিনি হেনস্থা হয়েছেন। তিনি নারী, কপালে টিপ দেন, সেটাই কারণ বলে তার ধারণা। কপালে টিপ কেন হেনস্থার কারণ হবে? যে কেউ এটা কপালে লাগাতে পারেন। ৬০ দশকে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে নারীরা পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে কপালে টিপ দিতেন। এখন শুনি কপালের টিপকে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে বর্জনের কথা। হিন্দুয়ানি বলতে কী বোঝায়? যা হিন্দুরা করে, তাই? হিন্দি সিরিয়ালে বা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে হিন্দু নারীদের যে পোশাক ও সজ্জা প্রদর্শনী হয়, সেগুলোও কি তবে হিন্দুয়ানি? কিন্তু সেগুলোতো প্রত্যাখ্যান করবার কথা শোনা যায় না। বরং সেগুলোর চাহিদা বা বাজার দর এদেশে অনেক বেশি।
হিন্দু বা মুসলমান বলে কি আসলে সমরূপ কোনো গোষ্ঠী আছে? ধর্মীয় পরিচয় এক হলেই কি সবার পোশাক, খাদ্য, সংস্কৃতি, জীবনাযাপন এক হয়? এক ভারতের মধ্যেই উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে খাবার, পোশাক, উৎসবে মেলা তফাত। কোনটিকে হিন্দুয়ানি বলব? সারা দুনিয়ার মুসলমানদের ইসলাম ধর্মের অবশ্য পালনীয় এবাদতে মিল আছে কিন্তু খাদ্য? পোশাক? উৎসব? বহু তফাত। বাংলাদেশের বাঙালি ও অন্যান্য জাতি পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষের উৎসব করেন। কেউ কেউ এই উৎসবকেও হিন্দুয়ানি বলেন, আসলে এদের কাছে মানুষের আনন্দ উৎসবই অসহ্য! ইরানে নতুন বছর শুরুর ‘নওরোজ উৎসব’ ইসলামপূর্ব কালের, তাই বলে সেখানকার ধর্মীয় নেতাদের তা বর্জনের কোনো ডাক দিতে দেখা যায় না। বরং এই উৎসব সেখানে সবচাইতে গুরুত্ব নিয়ে পালিত হয়। আসলে একেকটি অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যায় না। বাঙালি মুসলমান যখন খেতে বসে, তখন যা যা তার পছন্দ, মাছ শাকসবজি ভাত খিচুড়ি ভর্তা ভাজি দই মিষ্টি পিঠা সেগুলো কি বাঙালি হিন্দুদেরও পছন্দের খাবার নয়? তাহলে এগুলো কি মুসলমানি, না হিন্দুয়ানি? এসব খাবার হিন্দুয়ানি বলে বাদ দিয়ে আরব বা অন্য কোনো দেশের খাবার দিলে বাঙালি মুসলমানের ক’দিন তা ভালো লাগবে?
প্রকৃতির মতোই বৈচিত্র্যের মধ্যেই মানুষের সৌন্দর্য ও শক্তি। একদিকে পুঁজির বিশ্বায়ন হচ্ছে, সর্বশেষ প্রযুক্তি নিয়ে উন্নয়নের জয়গান, অন্যদিকে যেন নিজেকে ছোট করতে করতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে যাওয়ার পথে মানুষের যাত্রা। অন্যের প্রতি বিদ্বেষের বিষ শুধু যে অন্যকে বিষাক্ত করে তা নয়, তা নিজেকেও বিষে জর্জরিত করে। অজান্তেই অনেক পরিবারে অন্য ধর্ম, জাতি, ভাষা, অঞ্চল, সংস্কৃতির মানুষ সম্পর্কে অশ্রদ্ধা বিদ্বেষ তৈরি করা হয়, যার কারণে শৈশবেই বিষ ঢুকে যায়। এগুলোই ডালপালা মেলে। সমাজের ভেতর এগুলো টিকে থাকলে এর ওপর ভর করেই প্রতিক্রিয়াশীল, ধর্ম-বর্ণান্ধ রাজনীতি, দখল লুণ্ঠনের অর্থনীতি বেড়ে ওঠে। যারা এর সুবিধাভোগী, তারাই এই বিদ্বেষ চাষে তৎপর থাকে। অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক। প্রতিদিনের বাংলাদেশ এর সৌজন্যে

