বাংলাদেশ

লোপা মমতাজ

এ পৃথিবী একবার পায় তারে

ডিসেম্বর ২৩, ২০২২ ১১:২৯ দুপুর
এ পৃথিবী একবার পায় তারে

২০ ডিসেম্বর তাঁর ৯১তম জন্মবার্ষিকী। তিনি বাংলাদেশের একজন মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক, রাজনীতিবিদ, লেখক এবং কমিউনিস্ট। তিনি গণমানুষের মুক্তিতে বিশ্বাস করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি কথা বলেন, লেখেন। কোনো পুরস্কারের ধার ধারেন না, আদর্শিক জায়গা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোভনীয় চাকরি পর্যন্ত ছেড়ে দিতে পারেন, তিনি একজন সাহসী মানুষ, আমাদের দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, বদরুদ্দীন উমর। জন্মেছেন ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে। তাঁর বাবা আবুল হাশিম, মা মেহের বানু বেগম। বাবা ছিলেন অখণ্ড ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের মধ্যে ১৯৫০ সালে তাঁরা সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। পরবর্তীতে অক্সফোর্ডে পড়াকালীন বদরুদ্দীন উমর মার্ক্সবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে। তারপর ১৯৫৬ সালের পহেলা নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এক বছর পর যুক্ত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে। ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের যাত্রাও হয় তাঁর হাত ধরেই। ১৯৬৮ সালে তিনি পদত্যাগ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর যুক্ত হন সক্রিয় রাজনীতিতে। ১৯৫৯ সালের ৭ জুন চাচাতো বোন সুরাইয়া হানমকে বিয়ে করেন। তাঁদের পরিবারে তিন সন্তান। এক ছেলে ও দুই মেয়ে।

বদরুদ্দীন উমর বর্তমানে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি এবং বাংলাদেশ লেখক শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সংস্কৃতি নামক একটি রাজনৌতিক পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা একশর বেশি এবং সেগুলো উভয় বাংলাতেই সমাদৃত। তাঁর লেখা নিজের আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে, তাঁর দেখা দেশ, কাল, রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষিত। আজ তিনি বিরানব্বইয়ে পদার্পণ করেছেন। এখনও তাঁর কলমের ধার এতটুকু কমেনি। লিখে যাচ্ছেন।

বদরুদ্দীন উমর প্রথম জীবনে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি নির্ভেজাল, আরাম-আয়েশের জীবনযাপন করতে পারতেন। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঢাকা ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভকারী এবং চট্টগ্রাম কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত একজন ব্যক্তির পক্ষে একটি নিশ্চিত জীবন পাওয়া কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু তিনি তা বেছে নেননি। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার নিশ্চিত পেশার জীবন ছেড়ে স্বেচ্ছায় রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং সে রাজনীতি প্রথাগত রাজনীতি নয়, কমিউনিস্ট রাজনীতি। কমিউনিস্ট সংগঠনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি এখনও কমিউনিস্ট হিসেবেই রাজনীতি করছেন।

ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে লিখতে গিয়ে আইয়ুব-মোনেম সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি এটুকু উপলব্ধি করেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে তাঁর পক্ষে বেশিদূর কাজ করা সম্ভব নয়। ১৯৬৮ সালে তিনি পদত্যাগ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারপর পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) যোগ দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। প্রায় ছয় দশক ধরে নানা প্রতিকূলতা ও বৈরিতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, তিনি আজও সচেতনভাবে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় আছেন মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক-বিশ্লেষক এবং সংগঠক হিসেবে। লেখক ও রাজনৈতিক জীবনে বদরুদ্দীন উমরের কোনো আদর্শচ্যুতি ঘটেনি, তাঁর চিন্তা-চেতনার ধার এবং ভার এখনও আগের মতোই তীক্ষ্ণ। শ্রমজীবী-নিপীড়িত মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার লড়াইয়ে অবিচল এক সংগ্রামী মানুষ।

এখন পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১২০টি। একজন ভিন্নধারার ইতিহাসবিদ হিসেবে বদরুদ্দীন উমরের অসাধারণ গবেষণাগ্রন্থ ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’-এর তিনটি খণ্ড। এই একটি বইই তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। এ বইয়ের মাধ্যমে তিনি নবগঠিত পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসকে যেভাবে বিবৃত করেছেন, তার সমতুল্য নজির বাংলাদেশে মেলা ভার। প্রথমত ইতিহাস রচনায় তিনি এ ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষের সংগ্রামগুলোকে পাদপ্রদীপের আলোতে নিয়ে আসেন; যা প্রকৃতই ওই সময়ের ঘটনাবলির জনমানুষের ইতিহাস হয়ে উঠেছে।

একজন স্বীকৃত কমিউনিস্ট হওয়া সত্ত্বেও আজীবন তিনি ভারত ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, বুর্জোয়াদের আধিপত্যের বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণির মানুষের জন্য বিকল্প নেতৃত্ব দেওয়ার পরিবর্তে উভয় দেশের কমিউনিস্ট পার্টি হাস্যকরভাবে নিজেদেরকে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগী সংগঠনের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। যখন সমগ্র জাতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে সংগ্রামে ফুঁসছে, তখন কমিউনিস্ট পার্টির শ্রেণিসংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত থাকাকে তিনি বোকামি ও অজ্ঞানতা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি এটাও বলেছেন, বাংলাদেশের কোনো দল আদতে ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে নিজেদেরকে দাবি করার যোগ্য নয়।

ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি কখনও কুণ্ঠিত হননি। ১৯৬৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের উদ্যোগ বাড়ালে তিনি প্রায় এককভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ জন শিক্ষকের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেন। সেখানে ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন ও বেসামরিক মানুষ হত্যার প্রতিবাদ জানানো হয়। নৈতিক কারণে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তিন মাসের ফেলোশিপও প্রত্যাখ্যান করেন।

বদরুদ্দীন উমর আজীবন জাতিগত ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করার সকল প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন। কল্পনা চাকমাসহ পাহাড়ি এলাকার রাজনৈতিক কর্মীদের অপহরণের প্রতিবাদ করেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামের সঙ্গে মিলে গণআদালতের আয়োজন করেন।

বদরুদ্দীন উমর কখনও পুরস্কার ও প্রশংসার পরোয়া করেননি। তিনি মনে করেন, প্রতিটি পুরস্কারের জন্যই মূল্য দিতে হয়। একই সঙ্গে তিনি এটা বুঝতে পারেন না যে, যখন একজন লেখক নিজের মনের আনন্দের জন্যই লিখছেন, তখন কেন লেখক তার লেখার জন্য পুরস্কার পাবেন। এই চিন্তাধারা থেকেই তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদক, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, ইতিহাস কাউন্সিল ও ফিলিপস পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

বদরুদ্দীন উমর শৈশবে আবৃত্তি করতেন, নাটকে অভিনয় করতেন। শান্তিনিকেতনের সাবেক শিক্ষক সত্যেন ঘোষাল তাঁর স্কুলের হেডমাস্টার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর স্কুলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনেক বেড়ে যায়। স্কুলজীবনে তিনি শেকসপিয়র ও বার্নার্ড শ’র নাটক করেছেন। ১৯৪৭-এ রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকে অমল চরিত্রে অভিনয় করেন। এখনও রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতা তার মুখস্থ। প্রায়শই তা আবৃত্তি করেন।

তাঁর সম্পর্কে একটি ঘটনা বলে লেখাটি শেষ করছি। ১৯৪৪ সালে ক্লাস সেভেনে থাকার সময় ক্লাসের হাই বেঞ্চগুলো লো বেঞ্চের ওপর কাত করে রেখে চলে এসেছিলেন। দারোয়ান এ অবস্থা দেখে ক্লাস টিচার ধর্মদাস বাবুর কাছে অভিযোগ করেন, কিন্তু অপরাধী শনাক্ত করতে পারেননি। কিন্তু খারাপ সম্পর্কের কারণে অপর একটি ছেলে এই দুষ্কর্মের দায় অবন্তী নামের একটি ছেলের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে ধর্মদাস বাবু অবন্তীকে দাঁড় করিয়ে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় বকাবকি করতে শুরু করলে বদরুদ্দীন উমরের নিজের ভেতর একটা দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, এটা অবন্তী করেনি, আমি করেছি। ধর্মদাস বাবু অবন্তীকে ছেড়ে দিলেন কিন্তু প্রকৃত অপরাধীকে কিছু বললেন না। কারণ তিনি মনে করলেন, উমর অপরাধ স্বীকার করে নৈতিক সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। একজন সাহসী, আদর্শবাদী, দৃঢ়চিত্ত, নির্লোভ মানুষ বদরুদ্দীন উমরের জন্মদিনে তাঁকে স্যালুট। সৌজন্যে প্রতিদিনের বাংলাদেশ