দেখা হতেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালাম তাঁকে। দেয়ালঘেঁষা সোফায় বসতে বসতে হাত দিয়ে আমাকেও বসতে ইশারা করলেন। তাঁর মুখোমুখি বসতেই এবার মুখ খুললেন- 'জন্মদিন আর নতুন কী! তুমি এসেছো, আরও অনেকেই ফোন করেছে। কেউ কেউ আসবে। কিন্তু জন্মদিন নিয়ে আমার কখনোই কোনো উৎসাহ ছিল না। আমি নিজে কখনও জন্মদিনের অনুষ্ঠান করিনি।' বলতে চেষ্টা করলাম- তবুও আপনার জন্মদিনটি আমাদের কাছে বিশেষ দিন। আমার কথা শেষ হতেই মাথা বাঁকা করে একবার কাছে ফিরলেন। বললেন, 'অনেকদিন হলো। বিরানব্বইতে এলাম। এখন তো কানে কম শুনি, তা জানো। কথা জোরে জোরে বলো।' এইবার আমি খানিক এগিয়ে তাঁর কাছে বসি। তিনি, বদরুদ্দীন উমর আবার মুখ খুললেন- 'কী যেন বলতে চেয়েছিলে'? এইবার আমি আলোচনা বাড়ানোর জন্য আলাপ অন্যদিকে নিতে শুরু করি: আপনার বাবাও শেষ দিকে চোখের সমস্যায় ভুগেছিলেন। আপনি কানের সমস্যায়।
আমার কথা শেষ হতেই তিনি একবার আমার মুখের দিকে তাকালেন। তারপরে সোফার সঙ্গে হেলান দিয়ে সামনের সাদা দেয়ালে চোখ রাখলেন। খেয়াল করলাম তাঁর চোখ পিটপিট করছে। কী মনে করে উঠে দাঁড়ালেন। আমাকে হাত দিয়ে বসতে বলে ভেতরের ঘরে গেলেন। সেখানে দাঁড়িয়েই তাঁর মেয়েকে বললেন- শিঙাড়া, লাড্ডু আর চা দিতে হবে।
ফিরে এসে একই জায়গায় বসলেন। তারপর বললেন- 'কয়েকদিন আগে এক সাংবাদিক এসেছিল; আমার কাছে জানতে চাইল- এখন আমি কী পড়ছি, কী লিখছি। আমি উত্তর দেইনি। দেওয়ার দরকার মনে করিনি। এইসব প্রশ্ন আমার মতো লোকের কাছে জানতে চায় কেন! এটা জানতে চাইতে পারে কোনো সিনেমার নায়কের কাছে। তার কাছে সাংবাদিক প্রশ্ন করতে পারে- আপনার প্রিয় ফুলের নাম কী? প্রিয় রং কোনটি?' কথা শেষ করেই দেখলাম তিনি সামান্য হাসলেন যেন! একটু আগের থমথমে ভাবটা কেটেছে।
বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে দেখা হলে প্রতিবারই যে প্রশ্নটি তিনি করেন, সেভাবে জানতে চাইলেন- 'দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন? খুবই দুঃসময় যাচ্ছে। এখন তো ঘরের বাইরে বের হতে পারি না। লোকজনের সঙ্গে সেভাবে কথা বলতে পারি না। সাধারণ মানুষ কী বলে?'
বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের সূত্রে। সেটা সম্ভবত ২০১২-এর দিকে। তিনি 'পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি' নামে এক বইয়ের সন্ধান দিয়েছিলেন। মনে আছে শাহবাগের আজিজ সুপারমার্কেটে কিনতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছিলাম। তিন খণ্ডের বিশাল কলেবরের বইটি কেনার মতো টাকা তখন পকেটে ছিল না। এক খণ্ড কিনেছিলাম সেদিন। পরে মনে হয়েছিল, সেদিন তিন খণ্ড একত্রে না কিনতে পেরে লাভই হয়েছিল। এক খণ্ড কিনে এনে দ্রুত শেষ করেছিলাম। পরে আরও দুই খণ্ড একইভাবে কিনেছিলাম। বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ দেখার সূত্র তৈরি হয়েছিল ঠিক ওই কাছাকাছি সময়েই। ঢাকার মিরপুরে রূপনগর আবাসিক এলাকায় সৃষ্টি পাঠোদ্যান নামের একটি পাঠাগারের এক অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন। আমরা তখন সেই পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক। বই পড়া, আড্ডা দেওয়া- সবই পাঠাগারকেন্দ্রিক। সৃষ্টি পাঠোদ্যানের অনুষ্ঠানে সেদিন বদরুদ্দীন উমর এসেছিলেন অনুষ্ঠানের আয়োজকদের সবার হাজির হওয়ার আগেই। সেদিনই তাঁর সময়জ্ঞানের বিষয়ে ধারণা পেয়েছিলাম। সেদিন যে সাক্ষাতের সূত্রটি তৈরি হয়েছিল সেটি ধরেই এখনও বদরুদ্দীন উমরের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আসছি।
বদরুদ্দীন উমর জন্মেছিলেন ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বর্ধমানে। তাঁর বাবা আবুল হাশিম ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতা ছিলেন। ১৯৫০ সালে তাঁরা সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন উমর। এখন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচয়িতা হিসেবেও তিনি প্রথম দিকের একজন। উমর পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন ও অর্থনীতিতে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। শিক্ষকতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সময়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে অর্থাৎ, ষাটের দশকে বদরুদ্দীন উমর সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যে সাহসী ও যৌক্তিক লেখাগুলো লিখেছিলেন, তা এখনও এই অঞ্চলের 'বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের' পথ দেখিয়ে যাচ্ছে। সেই সময়ে আইয়ুব সরকারের দমন-পীড়নে উমর বুঝতে পেরেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি করে রাজনৈতিক চর্চা চালিয়ে যেতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন সেই সময়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে 'সংস্কৃতি' পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেছিলেন ১৯৭৪ সালে। তবে কয়েক সংখ্যা প্রকাশের পরই জরুরি অবস্থার কারণে সংস্কৃতি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। স্বাধীন দেশে 'সংস্কৃতি' বন্ধ হওয়ার বিষয়টি উমরকে স্বাধীন বাংলাদেশে শাসকদের চরিত্র বুঝতে সহায়তা করেছিল বলে বিভিন্ন সময়ে জানতে পেরেছি। ১৯৮১ সালে সংস্কৃতি আবার প্রকাশ হয়েছিল। পরে অনিয়মিত হয়ে গেলেও এখনও তা প্রকাশিত হচ্ছে।
বদরুদ্দীন উমর কেন এখনও প্রাসঙ্গিক রাখতে পেরেছেন নিজেকে- এমন আলোচনা প্রায়ই শুনতে পাই। এই কথার সহজ উত্তর হতে পারে- এখনও তিনি সক্রিয় আছেন বলেই তিনি প্রাসঙ্গিক। উমর লিখেছেন দুই হাতে। সত্যিকার অর্থেই দুই হাতে তিনি লিখেছেন। উমরের পাঁচ খণ্ডে 'আমার জীবন' নামের প্রায় ১৫৫০ পৃষ্ঠার আত্মজীবনীর দিকে তাকালে তাঁর লেখার ব্যাপ্তি বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে। একবার আলোচনার মাঝে জানতে চাইলাম, আপনার এত দীর্ঘ কলেবরের আত্মজীবনী লেখার পেছনে উদ্দেশ্য কী? তিনি স্বভাবজাত ক্ষেপে গিয়ে বললেন, 'লেখার পেছনে আবার উদ্দেশ্য কী থাকবে? আমার যা জীবন, তা-ই লিখেছি। যাদের জীবনে কোনো ঘটনা নেই তাঁরা কী বুঝবে! আমার কোনো লেখাতেই একটি বাক্যও অপ্রয়োজনীয় নয়।' ২০১৯ সালে বের হয় তাঁর আত্মজীবনীর পঞ্চম খণ্ড। এটা বের হওয়ার পরে জানতে চেয়েছিলাম, সামনে আরও লিখবেন কিনা? বলেছিলেন, 'আত্মজীবনী আর লিখব না। ওই পর্যন্তই থাকুক।' তারপরে আবার বললেন, 'এখন যে দুঃসময় চলছে তাতে আত্মজীবনী লেখার চেয়ে অন্য লেখা আরও গুরুত্বপূর্ণ'। বাংলা ভাষায় উমরের মতো আরও বিশাল পরিসরে আত্মজীবনী কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। রাহুল সাংকৃত্যায়ন পাঁচ খণ্ডে লিখেছেন 'আমার জীবনযাত্রা'। সেটি প্রায় ২৮০০ পৃষ্ঠার। উমর তাঁর আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় লিখেছিলেন :'একজনের জীবন সমসাময়িক সমাজ ও ইতিহাসের কতটুকু ধারণ করে তার উপরই নির্ভর করে এক একজনের আত্মজীবনীর মূল্য।' আমরা যখন উমরের এই কথার পেছনের দিকে তাকাই তখন স্মরণ করতে পারি- উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে উমরের পরিবার এই অঞ্চলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই পরিবারে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট, কৃষক সংগঠক ছিলেন। আবার এই পরিবারে ছিল চাকরিজীবী ও জমিদার। উমর দেখেছেন তাঁর বাবা-দাদার কাছে এই উপমহাদেশের তথা সর্বভারতীয় অনেক নেতা আসা-যাওয়া করতেন। সেখান থেকে বিদেশে শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, সক্রিয় রাজনীতি, দেশভাগের ফলে নিজের পরিবারে সৃষ্ট জটিলতা; আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে আন্ডারগ্রাউন্ডের জীবন, মস্কোপন্থি কমিউনিস্ট পার্টিতে না গিয়ে চীনপন্থি কমিউনিস্ট পার্টিতে যাওয়া, বাঙলাদেশ লেখক শিবির, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল এবং ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক কমিটি- এইসবের দিকে তাকালে উমরের দীর্ঘ জীবনের অর্থপূর্ণ পরিণতি দেখা যায়। বিরানব্বই বছরেও উমর এখনও যেভাবে তাঁর চিন্তা, লেখা ও সাংগঠনিক অবস্থান দিয়ে নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন তা বাংলাদেশে বিরল। বদরুদ্দীন উমরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। এহ্সান মাহমুদ : সহ-সম্পাদক, সমকাল

