বাংলাদেশ
খুলনা-৪ আসনের এমপি সালাম মুর্শেদীর গুলশানের সেই বাড়ি অবৈধ
ঢাকা: সাবেক ফুটবলার ও খুলনা-৪ আসনের এমপি আব্দুস সালাম মুর্শেদী গুলশানের যে বাড়িতে বাস করছেন সেই প্লটটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি। জাল জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধভাবে তিনি ওই বাড়িটি দখলে নিয়েছেন। সরকারি এক তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ওই প্লটটি সরকারের অনুকূলে আনতে এবং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সুপারিশ করা হয়েছে।
এরই মধ্যে গত ১ নভেম্বর সরকারের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়ে বাড়ি বানানোর অভিযোগে সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এ সম্পত্তি সম্পর্কিত সব কাগজপত্র ১০ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) রাজউক, গণপূর্ত বিভাগ ও সালাম মুর্শেদীকে নির্দেশ দেন আদালত।
এই নির্দেশনার আগেই বাড়িটির প্রকৃত অবস্থা কী- এ ব্যাপারে দুদকের আবেদনে একটি কমিটি গঠন করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। ৩ সদস্যের কমিটিতে ছিলেন এক রাজউক কর্মকর্তাও। গত ২০ নভেম্বর সেই কমিটি পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে জানায়, সরেজমিন পরিদর্শন ও গুলশান আবাসিক এলাকার লে-আউট নকশা পর্যালোচনা, রোড নম্বর ১০৪ ও রোড নম্বর ১০৩ এর সংযোগ স্থলের কর্নার প্লট/বাড়ির অবস্থান বিবেচনায় ২৭নং প্লটটি ১০৪নং রাস্তায় অবস্থিত। যা ১৯৮৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত ৯৭৬৪(১) নং পৃষ্ঠার ৪৬নং ক্রমিকে ‘খ’ তালিকাভুক্ত পরিত্যক্ত বাড়ি। অর্থাৎ ঢাকার গুলশান আবাসিক এলাকার গুলশান সিইএন(ডি) ব্লকের ১০৪নং রোডের ২৯নং হোল্ডিংস্থিত ২৭নং বাড়ি। সর্বশেষ জরিপ/সিটি জরিপে সংশ্লিষ্ট এলাকার সিইএন(ডি) ব্লকের ২৭নং প্লটের ৫২০৪ ও ৫২০৫ দাগসমূহ সিটি জরিপের ৯নং খতিয়ানভুক্ত যা সরকারের পক্ষে গণপূর্ত নগর উন্নয়ন বিভাগ ঢাকার নামে রেকর্ডভুক্ত।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মালেকা রহমানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-২৮ এর মূলে তার বরাবর প্রেরিত পত্রে জানানো হয় যে, সংশ্লিষ্ট এলাকার বাড়ি নং-সিইএন (ডি) ২৭, হোল্ডিং নং-২৯, রোড নং-১০৩, ঢাকার বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির ‘ক’ ও ‘খ’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি এবং অবমুক্তির কোনো অবকাশ নাই। এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটি বলেছে, বাস্তবে ওই এলাকায় রাজউকের লে-আউট নকশায় কথিত বাড়ির অস্তিত্ব বিদ্যমান নাই। এক্ষেত্রে সুকৌশলে ওই এলাকার ১০৪নং রোডে অবস্থিত ওই বাড়িটি ১০৩নং রোড দেখিয়ে জাল-কাগজপত্র সৃজনপূর্বক হস্তান্তর-নামজারিসহ অন্যান্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখা-৯ এর যুগ্মসচিব মো. মাহমুদুর রহমান হাবিবকে আহ্বায়ক করে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) মুহম্মদ কামরুজ্জামান ও সদস্য হিসেবে ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং শাখা-১১ এর উপসচিব জহুরা খাতুন। দুদকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত সেপ্টেম্বর মাসে এই কমিটি গঠন করে দেয়ে। গত ২০ নভেম্বর তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে। বৃহস্পতিবার সব নথি আদালতে দাখিল হলে এ মামলার পরবর্তী শুনানি হবে হাইকোর্টে।
এ বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী সায়েদুল হক সুমন জানান, তদন্ত কমিটি স্পষ্ট করে বলেছে, কাগজপত্রের আলোকে অর্পিত বাড়িটির হস্তান্তর প্রক্রিয়া বিধিসম্মত হয়নি। এর অর্থ কাগজপত্র জালিয়াতি করা হয়েছে এবং এটি সরকারের আনুকূল্যে আনা যেতে পারে। রাজউক পরিষ্কার করে বলছে, সালাম মুর্শেদী এ বাড়িটিতে অবৈধভাবে দখল করে আছে।
রিট আবেদনে বলা হয়, রাজধানীর গুলশান-২’র ১০৪ নম্বর সড়কে সিইএন(ডি)-২৭-এর ২৯ নম্বর বাড়িটি ১৯৮৬ সালের অতিরিক্ত গেজেটে ‘খ’ তালিকায় পরিত্যক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত। কিন্তু আব্দুস সালাম মুর্শেদী সেটি দখল করে বসবাস করছেন।
রিটে ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল, ২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি ও চলতি বছরের ৪ জুলাই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যানকে দেওয়া গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তিনটি চিঠি যুক্ত করা হয়েছে।
২০১৫ ও ২০১৬ সালে দেওয়া চিঠিতে পরিত্যক্ত বাড়ির তালিকা থেকে বাড়িটি অবমুক্ত না হওয়ার পরও আব্দুস সালাম মুর্শেদী কীভাবে বাড়িটি দখল করে আছেন, রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে এ ব্যাখ্যা চেয়েছিল পূর্ত মন্ত্রণালয়। কিন্তু রাজউক চেয়ারম্যান সে চিঠি আমলে না নেওয়ায় ফের ৪ জুলাই চিঠি দেওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, পরিত্যক্ত বাড়ির তালিকা থেকে ভবনটি অবমুক্ত না হওয়ার পরও কীভাবে রাজউক চেয়ারম্যানের দপ্তর থেকে সেটির নামজারি ও দলিল করার অনুমতি দেওয়া হলো, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু রাজউক চেয়ারম্যান সে ব্যাখ্যা দিতে অনীহা দেখিয়েছেন।
রিট আবেদনে এ অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশনা চাওয়ার পাশাপাশি পরিত্যক্ত বাড়ি দখলের কারণে আব্দুস সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, জানতে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে।
রিটে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব, রাজউক চেয়ারম্যান, দুদক চেয়ারম্যান, ঢাকার জেলা প্রশাসক ও আব্দুস সালাম মুর্শেদীকে বিবাদী করা হয়েছে। সুত্র কালবেলা

