অর্থনীতি

৯ মাসে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা

নভেম্বর ১৮, ২০২২ ৯:৩০ রাত
৯ মাসে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা

ঢাকা:: করোনা মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে ঋণ পরিশোধে ছিল বিশেষ শিথিলতা। তবে চলতি বছর কেউ সময়মতো কিস্তি না দিলে খেলাপি হচ্ছেন। এ কারণে অনেকটাই বেড়েছে খেলাপি ঋণ। কোনো না কোনো উপায়ে আবারও বিশেষ ছাড় মিলবে- এমন ধারণা থেকে অনেকে ঋণ পরিশোধ করছেন না। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটসহ নানা কারণে সংকটে পড়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না এমন ব্যবসায়ীও রয়েছেন। এমন বাস্তবতায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকায় ঠেকেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ৯ মাসে খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার ১২২ কোটি টাকা বা ৩০ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, পরিমাণের পাশাপাশি শতাংশ বিবেচনায়ও খেলাপি ঋণ বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট ঋণ ছিল ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। তিন মাস আগে ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ছিল ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর গত ডিসেম্বর শেষে ১৩ লাখ ১ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ ছিল খেলাপি। এর মানে প্রতি প্রান্তিকেই হার বেড়েছে।

ব্যাংকাররা জানান, ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করতে এমনিতেই একটি শ্রেণি সব সময়ই নানা উপায় খোঁজে। করোনার কারণে ২০২০ সালে কেউ এক টাকাও না দিলে তাকে খেলাপি করা হয়নি। পরের বছর যে পরিমাণ পরিশোধ করার কথা, কেউ ১৫ শতাংশ পরিশোধ করলে আর পরিশোধ করতে হয়নি। আবার কোনো একটি বিশেষ ছাড় মিলতে পারে এমন আশায় সক্ষমতা থাকলেও ঋণ পরিশোধে ঢিলেমি করছেন অনেকে। আয় থাকার পরও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে ঋণ পরিশোধ করছেন না। যে কারণে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালা শিথিল থাকলেও তেমন সাড়া নেই।

ব্যাংকারদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের খারাপ পরিস্থিতির কারণেও গ্রাহকদের একটি অংশ ঋণ পরিশোধে সক্ষম হচ্ছে না। কেননা করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্ববাজারে কাঁচামালসহ বেশিরভাগ পণ্যের দর বেড়েছে। অথচ চাহিদামতো বিদ্যুৎ, গ্যাস না পাওয়ায় বেশিরভাগ কারখানায় সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন হচ্ছে। আমদানিতে নানা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে পারছে না। এর মধ্যে ভোক্তাদের ওপর রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতির প্রভাব। এ ছাড়া গত জুলাইতে এক লাফে জ্বালানি তেলের দর ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে সব ক্ষেত্রে খরচের বাড়তি চাপ তো আছেই। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।

জানতে চাইলে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর. এফ. হোসেন বলেন, করোনা-পরবর্তী অর্থনীতিতে একটি চাপ ছিল। এটি সামলে উঠতে না উঠতে বিশ্বব্যাপী আরেকটি সংকট চলছে। যে কারণে বেশিরভাগ জিনিসের দর বেড়ে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে। আবার বিদ্যুৎ-গ্যাসের অভাবের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসবের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে একটি বড় কারণ ব্যাংক খাতের সুশাসনে ঘাটতি। খেলাপি ঋণ আদায়ে যেভাবে আইনি সহায়তা দরকার অনেক ক্ষেত্রে তা পাওয়া যাচ্ছে না। মামলা নিষ্পত্তিতে অনেক সময় লাগছে। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দশ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৬ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা, মোট খেলাপির যা ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। পরিমাণের দিক দিয়ে খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা এসব ব্যাংক হলো- রাষ্ট্রীয় মালিকানার জনতা, সোনালী, অগ্রণী, বেসিক, রূপালী, বেসরকারি ন্যাশনাল, ইসলামী, এবি, পদ্মা ও ওয়ান ব্যাংক। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে ৬৩ হাজার ২১৫ কোটি টাকা বা ৬১ দশমিক ২১ শতাংশ ছিল এসব ব্যাংকে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর হিসেবে আব্দুর রউফ তালুকদার দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণসহ চারটি সূচকের ভিত্তিতে খারাপ অবস্থায় থাকা ১০টি ব্যাংক আলাদাভাবে তদারকির উদ্যোগ নিয়েছেন। খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা এসব ব্যাংকের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এবি ও ওয়ান ব্যাংক রয়েছে এ তালিকায়। এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, আইসিবি ইসলামী ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক রয়েছে। পরিমাণ কম থাকলেও শতাংশ বিবেচনায় খেলাপি ঋণ অনেক বেশি রয়েছে এসব ব্যাংকে। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ৯০ শতাংশই খেলাপি। ব্যাংকটির ১ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা খেলাপি। আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৮৩ দশমিক ২০ শতাংশ বা ৬৮০ কোটি খেলাপি। আর বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা বা ৪৫ দশমিক ৪২ শতাংশ খেলাপি। সূত্র : বাংলা ভিশন টিভি